ঘরে বসেই শুরু করুন নিজের ই-কমার্স ব্যবসা (পর্ব ৫)

ecommerceগত পর্বে আমরা ই-কমার্স সাইট বানাতে কি কি লাগবে ও কেমন খরচ পরবে তা মোটামোটি বিশদভাবেই তুলে ধরেছি। এই পর্বে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব, আর তা হল “কি বেচব তা ঠিক করলাম, সাইটও বেশ ভালই বানালাম, কিন্তু যা বেচব, তা পাবো কোথায়… আর অর্ডার আসলে ডেলিভারিই বা করব কি করে?”

আগের পর্বগুলো যদি আপনাদের মিস হয়ে থাকে, এই লেখার শেষে লিঙ্ক দেয়া আছে… ঘুরে আসতে পারেন।

প্রোডাক্ট পাবো কোথায়?

এই সমস্যার তিনটা সমাধান হতে পারেঃ নিজে পণ্য তৈরি করে বেচুন; নিজে পণ্য খরিদ করে বেচুন; বা অন্যের পণ্য এনে “ডিস্ট্রিবিউটার/প্রোমোটার” এর কাজ করুন।

নিজে পণ্য তৈরি করে বেচুন

এতে একদিকে যেমন লাভের পরিমান থাকে সবচে বেশি, তেমনি ঝুঁকির পরিমানও হয় সবচে বেশি। তাছাড়া শুরুর খরচটাও তখন এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যায়। আবার এতে পন্যর গুনগত মান রক্ষা করা পুরোপুরি আপনার হাতে চলে আসে। এবং আপনিই যেহেতু প্রোডাক্ট-এর উৎপাদনকারী, তাই সাপ্লাই এর ঘাটতিও আপনি মোকাবেলা করতে পারবেন ভাল মত। টি শার্ট, চামড়াজাত পণ্য, কাস্টম মেড উপহার সামগ্রী, খাবার ইত্যাদি হতে পারে এই ধরনের পন্যর উদাহরণ।

নিজে পণ্য কিনে এনে বেচুন

বাংলাদেশের ৯৫% দোকানই এই নীতিতে চলে… এবং আপনিও খুব সহজেই এভাবে আপনার ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। ই-কমার্স ব্যবসাকে অন্যান্য খুচরা ব্যবসা থেকে বেশি আলাদা ভাবা উচিত না। সব কিছুই এক… শুধু এটা আরও অরগানাইযড ও প্রসার-নির্ভর। এই পদ্ধতিতে সামনে আগালে আপনার লাভ কিছুটা কম হবে, কিন্তু আপনি কখনো পন্যর ঘাটতি অনুভব করবেন না। যখন যা দরকার আপনি পাইকারিতে কিনে আনতে পারবেন। অবশ্য এই পদ্ধতিতেও শুরুর খরচতা একটু বেড়ে যায়… কারন আপনাকে নিজের টাকা দিয়ে পণ্য খরিদ করতে হয়। এখানে সবচে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে, তা হল পন্যর গুনগত মান। পন্যের মান যেন কখনই খারাপ না হয়। বাজার ভর্তি এখন ডিওডরেন্টের নকল জাত। আপনি যখন কিনবেন, ভাল মত জাচাই করে কিনবেন। এতে মানুষের আস্থা অর্জন করে বেশিদিন ব্যবসায় টিকে থাকতে পারবেন। এই পদ্ধতিতে পন্যের যোগান নিশ্চিত করার জন্য আপনাকে জানতে হবে, কোথায় কোন প্রোডাক্ট পাইকারিতে পাওয়া যায়। কিছু পাইকারি বাজার হল চকবাজার, টিকাটুলি, ডিসিসি মারকেট, আজিজ মার্কেট ইত্যাদি। এছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির ডিলারদের সাথেও যোগাযোগ করতে পারেন পণ্য সরবরাহ করার ব্যাপারে।

অন্যের পণ্য এনে প্রোমট করুন

এই পদ্ধতিতে আপনার লাভ সবচে কম হবে, কিন্তু আপনি প্রায় বিনা খরচে ব্যবসা শুরু করতে পারবেন। এই পদ্ধতিতে সাধারণত “বাকি” তে আপনি পণ্য আনবেন… বিক্রির পর উৎপাদনকারীকে টাকা দিবেন… বিক্রি না হলে শর্ত মতাবেক পণ্য ফেরত দিতে পারতে পারেন। এতে আপনার ঝুঁকিও অনেক কমে যায়। বর্তমানে এটাই ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করার সবচে জনপ্রিয় রাস্তা। দুই ভাবে এই কাজ টা আপনি করতে পারেন…

ঘরে বসে ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করতে চাইলে আপনি আপনার এলাকার বিভিন্ন দোকানের সাথে প্রথমে কথা বলুন… তাদেরকে বলুন যে আপনি তাদের পণ্য বিক্রি করে দিবেন কমিশানের বিনিময়ে। এরপর তাঁর দোকানের প্রোডাক্টগুলোর ছবি আপনার সাইটে উঠান। অর্ডার আসলে দকানে গিয়ে কালেক্ট করে নিয়ে আসুন। রকমারি ডট কম এই মডেল এর উপর ভিত্তি করে কাজ করে।

এটা ছিল একদম শুরুর ধাপ… বুদ্ধি করে না চললে এভাবে খুব বেশি আগানো কঠিন। এর পরিবর্তে আপনি বিভিন্ন ছোট থেকে মাঝারী ব্র্যান্ডশপ কে টার্গেট করতে পারেন। এমন অনেক ব্র্যান্ডশপ আছে যারা শুধুমাত্র ফেইসবুকের মাধ্যমে ব্যবসা করে। প্রথমে ফেইসবুকের সকল সম্ভাবনাময় প্রভাইডারের তালিকা তৈরি করুন। সাধারণত তাদের ফেইসবুক পেইজে ফোন নাম্বার দেয়া থাকে… উনাদের সাথে যোগাযোগ করে মিটিং সেট করে ফেলুন। আপনি উনাদেরকে কি অফার করছেন, তার উপর নির্ভর করবে, উনাদের পণ্য প্রোমট করার দায়িত্ব আপনি পাবেন, নাকি পাবেন না।

মাথায় রাখুনঃ

১। যে রাস্তাতেই আগান না কেন, গুনগত মান নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। অনলাইনে মানুষ পণ্য দেখে কেনে না, কেনে ছবি দেখে। তাই এক্ষেত্রে কাস্টমারের “বিশ্বাস অর্জন” একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বাস অর্জন ও তা রক্ষা করার চেষ্টা করুন।

২। শুধু মাত্র একটা রাস্তা অবলম্বন না করে, দুটি বা তিনটি পদ্ধতিতেই একটু একটু আগান। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, নিজে কিছু পণ্য কিনে এনে বিক্রি করা (৩০%) ও অন্যের পণ্য প্রোমোট করার (৭০%) মধ্যে একটা সমতা আনতে পারলে তা “প্রফিট” করতে সাহায্য করে।

৩। একটি ই-কমার্স ব্যবসার ভাল করার পেছনে হরেকরকমের পণ্য থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাইটে যেন নিয়মিত নতুন পণ্য যোগ করা হয়, ও স্টক ফুরিয়ে যাওয়া পণ্য সরিয়ে নেয়া হয়, এই বিষয়ে বিশেষ খেয়াল দেয়া প্রয়োজন।

পণ্য ডেলিভারি দেবেন কি করে?

একটি খুচরা দোকানের সাথে একটি ই-কমার্স ব্যবসার সবচেয়ে বড় পার্থক্য হল এর গন্ডি… সারা বাংলাদেশ এমনকি সারা পৃথিবী থেকে আপনার কাছে অর্ডার আসতে পারে। আপনি কিন্তু একটি (বা একাধিক) আউটলেট বা অফিস বা স্টোর থেকেই তা কাস্টমারের কাছে পৌঁছে দেবেন। তাই আপনার ডেলিভারি সিস্টেম তৈরি করতে হবে নিপুন ভাবে। ডেলিভারির ক্ষেত্রে কয়েকটি জিনিষ মাথায় রাখুনঃ

১। কাস্টমারের বাসায় সরাসরি ডেলিভারি দেব নাকি কোন নির্দিষ্ট পয়েন্ট পর্যন্ত?
২। অর্ডার করার পর কতদিনের মধ্যে পণ্য কাস্টমারের হাতে পৌঁছাবে?
৩। একটি পণ্য ডেলিভারি করতে সর্বচ্চো কত টাকা খরচ হতে পারে?
৪। এই খরচ কে বহন করবে? আমি না কাস্টমার?

ডেলিভারি দেয়ার অনেক চমক প্রদক রাস্তা আছে। কিন্তু আমরা এখানে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে খাপ খায় এমন কিছু জনপ্রিয় মাধ্যম তুলে ধরব।

১। অফিস পিকাপ ও কুরিয়ারঃ কাস্টমার আপনার অফিস থেকে বা তার বাসার কাছের কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে পণ্য সংগ্রহ করবে। ঢাকার বাইরের অর্ডারের ক্ষেত্রে এই পন্থা বেশি জনপ্রিয়। এর মাধ্যমে কাস্টমার কুরিয়ার সার্ভিসের অফিস থেকে আপনার পাঠানো পণ্য কালেক্ট করে নিতে পারে (টাকা কি পণ্য পাওয়ার আগে দেবে, নাকি পরে?)।

২। লোকাল কুরিয়ারের মাধ্যমে হোম ডেলিভারিঃ ঢাকার মধ্যে হোম ডেলিভারি দেয়াটা সব থেকে সহজ। বর্তমানে, ঢাকায় এমন প্রচুর (লোকাল) কুরিয়ার সার্ভিস আছে, যারা ঢাকার ভেতর হোম ডেলিভারি দেয় ও “ক্যাশ অন ডেলিভারি” এর সুবিধাও প্রদান করে। এরা আপনার অফিস থেকে দিন শেষে পণ্য নিয়ে যাবে ডেলিভারির জন্য। একটু খোঁজ করলেই আপনি এদের সন্ধান পেয়ে যাবেন। খরচ পড়বে প্রতি ডেলিভারি ৩৫ থেকে ৬০ টাকা। এছাড়া, এরামেক্স ও ই-কমার্স সাইটগুলকে এই সুবিধা দেয়… ওদের রেইট টা অবশ্য একটু বেশি।

৩। নিজস্ব লোক দ্বারা ডেলিভারিঃ এই বিষয়ে আসলে লেখার কিছু নেই। খরচ সামলাতে পারলে এটাই সব থেকে ভাল।

মাথায় রাখবেনঃ

১। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটে অনেক লোকাল কুরিয়ার সার্ভিস আছে। এরা আপনাকে হোম ডেলিভারির পাশাপাশি ক্যাশ অন ডেলিভারি এর সুবিধা দেবে। কিন্তু বেশিরভাব ক্ষেত্রেই এই সব কুরিয়ার বেশি প্রফেশনাল হয় না। তাই সব বুঝে শুনে ব্যবস্থা নিতে হবে।
২। পণ্য অর্ডার করার পর ডেলিভারি করতে যেন বেশি দেরি না হয় সে দিকে নজর রাখবেন। ৩ দিন ছাড়িয়ে গেলে অর্ডার বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

লেখাটি আপনাদের কাজে এসেছে কি না, বা আরও কোন বিষয় নিয়ে আলচনা করলে আরও কাজে লাগত তা আমাদের জানাবেন। পরবর্তী পর্ব পড়ার আমন্ত্রন রইল।

সিরিজের সবগুলো আর্টিকেলঃ
১। ই-কমার্স বিজনেস সম্পর্কে কিছু ভুল ধারনা যা আপনাকে ঝেড়ে ফেলতে হবে (পর্ব ১)
২। কাস্টমার নির্বাচন, প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগে থাকা ও প্রাথমিক প্ল্যানিং (পর্ব ২)
৩। নাম নির্বাচনের কিছু বাস্তবমুখী টিপস (পর্ব ৩)
৪। সাইট বানাতে কি কি লাগবে ও শুরুর খরচ (পর্ব ৪)
৫। প্রোডাক্ট পাবেন কোত্থেকে? ডেলিভারি দেবেন কি করে? (পর্ব ৫)
৬। কিভাবে মার্কেটিং করবেন, কিভাবে সেল বাড়াবেন? (পর্ব ৬)
৭। কখন বুঝবেন “নেক্সট স্টেপ” নেয়ার সময় চলে এসেছে (পর্ব ৭)

আর্টিকেলটি ভাল লাগলে লাইক করুন, শেয়ার করুন। কমেন্ট করে আপনার মতামত জানান।